skip to content

গুলবাহার

গুডরিডস টপ ১০০: ক্লাসিক সাহিত্যের অদ্ভুত অনুপস্থিতি

• 4 min read

গুডরিডসের ‘টপ ১০০’ তালিকা দেখে আমার মাথা ঘুরে যাচ্ছে। কোন তালিকার কথা বলছি? ব্যবহারকারীদের রেটিংয়ের ভিত্তিতে তৈরি সেরা ১০০ বইয়ের তালিকা এটি। তালিকার বইগুলোর প্রকাশকাল—অর্থাৎ ‘আধুনিকতা’ আমাকে বেশ অবাক করেছে। বিশেষ করে সিনেমা বা গানের মতো অন্যান্য মাধ্যমের ইউজার-রেটেড তালিকার সঙ্গে তুলনা করলে এই খটকাটা আরও বাড়ে।

কয়েক মাস আগে এক টুইটে দেখলাম, একজন আক্ষেপ করে বলছেন—আজকের পাঠকরা ‘রসাতলে’ গেছেন। কারণ, মবি ডিক-এর গড় রেটিং ৩.৬, অথচ ক্যাচিং ফায়ার রেট পেয়েছে ৪.৩। মন্তব্যের ঘরে অনেকেই ক্লাসিক উপন্যাসের প্রতি বর্তমান পাঠকদের উদাসীনতা নিয়ে অভিযোগ করছিলেন। প্রমাণ হিসেবে তাঁরা গুডরিডসের টপ ১০০ তালিকার দিকে আঙুল তোলেন। কৌতূহলবশত আমিও তালিকাটা দেখলাম। দেখে তো আমি অবাক—অভিযোগটা কিন্তু একেবারে ভিত্তিহীন নয়!

দু-একটা ক্লাসিক বই কম রেটিং পেলে সমস্যা ছিল না। কিন্তু সামগ্রিক চিত্রটা আমাকে হতবাক করেছে। ক্লাসিক তো ক্লাসিকই—কারণ সেগুলো… ভালো মানের, তাই না?

তুলনার খাতিরে আমি লেটারবক্সড টপ ২৫০, আইএমডিবি টপ ২৫০, রেট ইয়োর মিউজিক (আরওয়াইএম) এবং এওটিওয়াই-এর সর্বোচ্চ রেটিংপ্রাপ্ত তালিকাগুলো খুলে দেখলাম।

সাহিত্য বা সঙ্গীতের চেয়ে চলচ্চিত্র নিয়ে আমি বেশি স্বচ্ছন্দ। লেটারবক্সড আর আইএমডিবির সেরা ছবির তালিকায় বেশ মিল রয়েছে, যদিও ক্রম বা র‍্যাঙ্কিং আলাদা। দুই তালিকাতেই আছে পুরনো হলিউডের ক্লাসিক (টুয়েলভ অ্যাংরি মেন, কাসাব্লাঙ্কা), নিউ হলিউডের ছবি (দ্য গডফাদার, অ্যাপোক্যালিপস নাউ), এশীয় পরিচালকদের কাজ (আকিরা কুরোসাওয়া, মাসাকি কোবায়াশি) এবং ইউরোপীয় পরিচালকদের সিনেমা (আন্দ্রেই তারকোভস্কি, ভিত্তোরিও দে সিকা)। বেশ চমৎকার বৈচিত্র্য। এই তালিকা আমাকে একদমই অবাক করেনি—সেরা ২৫০-এর তালিকায় একজন দর্শক সচরাচর যেসব ছবি আশা করেন, তার সবই এখানে আছে।

আমার মনে হয়েছিল, সহজবোধ্যতা এখানে বড় ভূমিকা রাখছে। ২০২০-এর দশকের মানুষের জন্য ১৯৪০-এর ছবি দেখা যতটা সহজ, মধ্যযুগের কোনো লেখা পড়া ততটাই কঠিন হতে পারে।

তবু, ১৯০০-এর দশক থেকে প্রকাশিত ‘মডার্ন ক্লাসিক’ও তো অনেক আছে। টু কিল আ মকিংবার্ড বা নাইন্টিন এইটি-ফোর-এর মতো বইগুলো কোথায়? আমি যদি বিংশ শতাব্দীর শুরুর কোনো ছবির ইংরেজি বুঝতে পারি, তবে সেই সময়কার উপন্যাস পড়তে অসুবিধা কোথায়? পরীক্ষা করে দেখার জন্য ১৯৩৮ সালের উপন্যাস রেবেকা হাতে তুলে নিলাম। কোনো অসুবিধা ছাড়াই এর গদ্যশৈলী বুঝতে পারছি। অবশ্য এটি মাত্র একটি বই। ওই সময়কার অন্য উপন্যাস কঠিন মনে হলে পাঠকরা জানাতে পারেন। আমি জনপ্রিয় ক্লাসিক ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট পড়েছি—সেটি বোঝাও তেমন কঠিন ছিল না।

আরও মজার বিষয় হলো, তালিকার কয়েকটি ছবি ক্লাসিক বই অবলম্বনে নির্মিত। ডুন তো আছেই, আরেকটি উদাহরণ হলো টলস্টয়ের ওয়ার অ্যান্ড পিস। চার পর্বের এই ছবি—যার দৈর্ঘ্য ৪১৩ মিনিট—লেটারবক্সডে ৮২ নম্বরে আছে ৪.৪ রেটিং নিয়ে। সাধারণ দর্শকের জন্য বেশ কঠিন বা ধীরগতির ছবি এটি! অথচ মূল বইটির রেটিং গুডরিডস টপ ১০০-এ ওঠার যোগ্যতার চেয়ে প্রায় ০.৩ পয়েন্ট কম।

আরওয়াইএম (RYM) আর এওটিওয়াই (AOTY)-এর ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। দুই ওয়েবসাইটের শিল্পীদের তালিকায় ব্যাপক মিল রয়েছে। দুটোই মূলত আধুনিক সঙ্গীত রেটিংয়ের জন্য ব্যবহৃত হয়। তাই এখানে ‘ক্লাসিক’ বলতে বিটোফেন নয়, বিটলসকে বোঝায়। অ্যাবি রোড দুই তালিকাতেই আছে—এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের সঙ্গীতের জন্ম হয়েছে, তাই ‘ক্লাসিক’ হিসেবে গণ্য হওয়ার সময়কালও ভিন্ন। এই হিসেবে উ-ট্যাং ক্ল্যান (১৯৯০-এ গঠিত) আর জন কলট্রেন (১৯৬০-এ সক্রিয়)—উভয়েই নিজ নিজ ধারায় ক্লাসিক। এবং হ্যাঁ, তাঁরা উভয় তালিকাতেই আছেন।

আবার ভাবলাম, এই দুটি ওয়েবসাইট যেহেতু আধুনিক সঙ্গীত নিয়ে কাজ করে, তাই ১৯৬০-এর অ্যালবাম শোনা ১৯৬০-এর ছবি দেখার মতোই সহজ ব্যাপার।

এবার গুডরিডসে ফিরে আসি। আমি নিশ্চয়ই পাগল নই; ক্লাসিকের এমন অভাব দেখে হতবাক হওয়াটাই স্বাভাবিক। আমি নিজেকে ‘এলিটিস্ট’ বা আঁতেল প্রমাণ করতে চাইছি না, কিন্তু দ্য কাউন্ট অফ মন্টে ক্রিস্টো-এর ওপরে হ্যারি পটার ফ্যানফিকশন ৬২ নম্বরে অবস্থান করছে—এটা মেনে নেওয়া কঠিন। ক্লাসিক সাহিত্যে প্রবেশের ‘বাধা’ বা আড়ষ্টতা বেশ প্রবল (কিশোর বয়সে আমিও প্রাইড অ্যান্ড প্রিজুডিস শেষ করতে পারিনি), কিন্তু এখন কি সেই বাধা আর কেউ অতিক্রম করতে চাইছেন না? বেশিরভাগ রেটিং কি স্কুলের সিলেবাসে পড়তে বাধ্য হওয়া বিরক্ত ছাত্রছাত্রীদের দেওয়া? নাকি পাঠকরা ক্লাসিক বইগুলোকে অনেক বেশি কঠিন মানদণ্ডে বিচার করছেন? নাকি সেগুলোকে সমসাময়িক চশমায় দেখছেন?

জানি না। এই চিন্তা হয়তো অন্য মাধ্যমের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে, কিন্তু তাদের তালিকাগুলোর চিত্র তো সম্পূর্ণ ভিন্ন!

প্রাসঙ্গিক