skip to content

গুলবাহার

ভায়োলা ঝাউ

প্রতি কয়েক মাসে একবার মা হাসপাতালে যান। ব্যাগে ভরে নেন এক জোড়া কাপড়, একগাদা চিকিৎসা রিপোর্ট আর কয়েকটা সেদ্ধ ডিম। তারপর দেড় ঘণ্টার দ্রুতগামী ট্রেনে চড়ে পৌঁছান পূর্ব চীনের হাংচৌ শহরে। সেখানে একটা হোটেলে রাত কাটান।

পরদিন সকাল ৭টায় তিনি লাইনে দাঁড়ান শত শত রোগীর সঙ্গে। রক্ত পরীক্ষার জন্য জমায়েত হওয়া দীর্ঘ হলঘরটি তখন কাঁচাবাজারের মতো সরগরম। বিকেলে রিপোর্ট হাতে পেয়ে বিশেষজ্ঞের চেম্বারে যান। সেখানে সময় পান মাত্র তিন মিনিট। ভাগ্য ভালো থাকলে হয়তো পাঁচ মিনিট। চিকিৎসক রিপোর্ট ঝটপট দেখে কম্পিউটারে প্রেসক্রিপশন টাইপ করেন। তারপর তাড়াহুড়ো করে পরবর্তী রোগীকে ডাক দেন। মা ব্যাগ গুছিয়ে নেন এবং দীর্ঘ যাত্রা শেষে বাড়ি ফেরেন।

কিন্তু ডিপসিকের আচরণ ছিল অন্য রকম।

গত শীতকাল থেকে চীনের শীর্ষস্থানীয় এই এআই চ্যাটবট ব্যবহার করে নিজের রোগের লক্ষণ যাচাই করতে শুরু করেন মা। সোফায় শুয়ে আইফোনে অ্যাপটি খুলতেন তিনি।

প্রথম বার্তাটি পাঠান ২ ফেব্রুয়ারি। লিখলেন, “হাই।”

“হ্যালো! আজ আমি আপনাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি?” সঙ্গে একটি হাসিমুখ ইমোজি।

মার্চে জিজ্ঞেস করলেন, “মিন করপাসকুলার হিমোগ্লোবিন কনসেন্ট্রেশন (MCHC) বেশি হলে কী হয়?”

এপ্রিলে বললেন, “রাতে দিনের চেয়ে বেশি প্রস্রাব করি।”

কয়েক দিন পর: “কিডনি সঠিকভাবে রক্ত সঞ্চালন না করলে কী করব?”

প্রশ্নের পর প্রশ্ন। খাবার, ব্যায়াম, ওষুধ নিয়ে পরামর্শ চাইতেন। কখনো কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা “ড. ডিপসিক”-এর ভার্চুয়াল চেম্বারে কাটাতেন। আল্ট্রাসাউন্ড স্ক্যান আর ল্যাব রিপোর্ট আপলোড করতেন। ডিপসিক ব্যাখ্যা করত, আর তিনি সেই অনুযায়ী জীবনযাত্রা ঠিক করতেন। চ্যাটবটের পরামর্শে চিকিৎসকের দেওয়া ইমিউনোসাপ্রেস্যান্ট ওষুধের মাত্রা কমিয়ে দেন। শুরু করেন গ্রিন টি এক্সট্র্যাক্ট খাওয়া। তিনি ছিলেন উচ্ছ্বসিত।

একবার প্রশংসা করে লিখলেন, “তুমি আমার সেরা স্বাস্থ্য উপদেষ্টা!”

জবাবে এল: “আপনি এমন বলায় সত্যিই খুশি হলাম! আপনাকে সাহায্য করতে পারা আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা~ 🥰 আপনার স্বাস্থ্য সচেতনতাও অসাধারণ!”

এআই-এর সঙ্গে তাঁর এই সম্পর্ক দেখে আমি বিচলিত। মায়ের বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে, আমি দূরে থাকি, মায়ের কথা শোনার, তাঁর সঙ্গে কথা বলার মতো পাশে আর কেউ নেই।


“চিকিৎসকরা বরং মেশিনের মতো”

প্রায় তিন বছর আগে চ্যাটজিপিটি চালু করার মাধ্যমে ওপেনএআই লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের (LLM) জগতে এক নতুন যুগের সূচনা করে। চীন-যুক্তরাষ্ট্রসহ সর্বত্র চ্যাটবট এখন সামাজিক জীবনের প্রতিটি অংশে জড়িয়ে পড়েছে। মায়ের মতো রোগীদের কাছে, যারা প্রথাগত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সময় বা যত্ন পান না, তাদের কাছে এই চ্যাটবট হয়ে উঠেছে এক বিশ্বস্ত বিকল্প। এআইকে এখন ভার্চুয়াল চিকিৎসক, মানসিক স্বাস্থ্য থেরাপিস্ট আর বয়োজ্যেষ্ঠদের রোবট সঙ্গী হিসেবে রূপ দেওয়া হচ্ছে। অসুস্থ, উদ্বিগ্ন, একাকী—যারা সঠিক চিকিৎসা সুবিধা ও মনোযোগের অভাবে ভুগছেন, তাদের কাছে এআই-এর বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার ও সহানুভূতিশীল কণ্ঠস্বর বুদ্ধিমান ও সান্ত্বনাদায়ক সঙ্গীর মতো মনে হয়। সঙ্গী-সন্তান-বন্ধু-প্রতিবেশীর বিপরীতে চ্যাটবট সবসময়ই হাতের কাছে পাওয়া যায়। সবসময়ই জবাব দেয়।

উদ্যোক্তা, ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট আর কিছু চিকিৎসক এআইকে অত্যধিক চাপে থাকা স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এবং ক্লান্ত যত্নদাতাদের (caregivers) বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করছেন। অপরদিকে নীতিবিদ, ক্লিনিশিয়ান ও গবেষকরা মেশিনের ওপর চিকিৎসার ভার ছেড়ে দেওয়ার ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করছেন। হ্যালুসিনেশন (ভুল তথ্য তৈরি) ও পক্ষপাতিত্ব তো আছেই, এতে জীবন বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকিও থাকে।

মাসের পর মাস মায়ের নতুন এআই চিকিৎসকের প্রতি আকর্ষণ বাড়তে থাকে। মে মাসে আমাকে মা বললেন, “ডিপসিক অনেক বেশি মানবিক। চিকিৎসকরা বরং মেশিনের মতো।”

২০০৪ সালে মায়ের দীর্ঘস্থায়ী (chronic) কিডনি রোগ ধরা পড়ে। সেই সময় আমরা ছোট শহর ছেড়ে ৮০ লাখ জনসংখ্যার প্রাদেশিক রাজধানী হাংচৌতে চলে এসেছিলাম। প্রাচীন মন্দির ও প্যাগোডার জন্য বিখ্যাত হাংচৌ ছিল নবীন প্রযুক্তি কেন্দ্রও। জ্যাক মা ১৯৯৯ সালে এখানেই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আলিবাবা—যে কোম্পানি পরে ডিপসিককে পৃষ্ঠপোষকতা দেবে।

হাংচৌতে আমরাই ছিলাম একে অপরের নিকটতম পরিবার। আমি চীনের এক-সন্তান নীতির কোটি কোটি সন্তানের একজন। বাবা নিজ শহরে চিকিৎসক হিসেবে কাজ করতেন, কদাচিৎ আসতেন—বাবা-মায়ের সম্পর্কের মধ্যে সবসময়ই কিছুটা দূরত্ব ছিল। মা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত শেখাতেন, রান্না করতেন, আমার পড়াশোনার দেখাশোনা করতেন। বছরের পর বছর আমি তাঁর উদ্বেগঘন হাসপাতাল পরিদর্শনে সঙ্গী ছিলাম, প্রতিটি ল্যাব রিপোর্টের জন্য উদ্বিগ্ন থাকতাম—যেগুলো শুধু কিডনির অবস্থার ধীরে ধীরে অবনতিই দেখাচ্ছিল।

চীনের স্বাস্থ্যসেবায় রয়েছে তীব্র বৈষম্য। দেশের শীর্ষ চিকিৎসকরা কাজ করেন অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠিত সরকারি হাসপাতালে, যার অধিকাংশই অর্থনৈতিকভাবে উন্নত পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত। সেখানে বহুতল ভবনে ক্লিনিক, ল্যাব ও ওয়ার্ড। সর্ববৃহৎ হাসপাতালগুলোতে হাজার হাজার শয্যা। গুরুতর রোগীদের দূর-দূরান্ত থেকে, কখনো সমগ্র দেশ থেকে, এই হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিতে আসতে দেখা যায়। চিকিৎসকেরা প্রতিদিন ১০০-এর বেশি রোগী দেখেন, রীতিমতো হিমশিম খান।

হাসপাতালগুলো সরকারি হলেও এগুলো বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত। বাজেটের মাত্র ১০% সরকার থেকে আসে। চিকিৎসকদের মূল বেতন নগণ্য, লাভের ভিত্তিতে তাঁরা বিভাগীয় বোনাস পান। সাম্প্রতিক দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের আগে ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহকারী কোম্পানি থেকে ঘুষ নেওয়া ছিল সাধারণ ঘটনা।

বয়স্ক জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছেই। ব্যবস্থার ব্যর্থতায় চিকিৎসকদের প্রতি সাধারণ মানুষের ব্যাপক অবিশ্বাস জন্মেছে। গত দুই দশকে চিকিৎসক-নার্সের ওপর শারীরিক হামলার ঘটনাও ঘটেছে, বাধ্য হয়ে বড় হাসপাতালগুলোতে নিরাপত্তা চৌকি বসাতে হয়েছে।

হাংচৌতে মায়ের সঙ্গে কাটানো আমার আট বছরে আমি চীনা হাসপাতালের কোলাহলপূর্ণ, অতিব্যস্ত পরিবেশে অভ্যস্ত হয়ে গেছিলাম। কিন্তু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মায়ের সঙ্গে সময় কাটানো কমতে থাকে। ১৪ বছর বয়সে বোর্ডিং স্কুল, সপ্তাহে একদিন বাড়ি আসা। হংকংয়ে বিশ্ববিদ্যালয় এবং চাকরির পর মা অবসর নিয়ে নিজ শহরে ফিরে যান। তখন থেকেই শুরু হয় হাংচৌয়ের নেফ্রোলজিস্টের কাছে দুই দিনের ভ্রমণ। কিডনি সম্পূর্ণ বিকল হলে পেটে প্লাস্টিকের নল বসিয়ে বাড়িতে পেরিটনিয়াল ডায়ালিসিস শুরু করেন। ২০২০ সালে সৌভাগ্যক্রমে কিডনি প্রতিস্থাপনের সুযোগ পান।

অস্ত্রোপচার আংশিক সফল হয়। তবে নানা জটিলতার শিকার হন—শারীরিক ধকল, বর্ডারলাইন ডায়াবেটিস, ঘুমের সমস্যা। নেফ্রোলজিস্ট তাঁকে যেন শুধুই এক রোগী থেকে আরেক রোগীতে পার করছিলেন।

বাবার সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়। তিন বছর আগে তাঁদের বিচ্ছেদ ঘটে। আমি নিউইয়র্ক সিটিতে চলে আসি। মাঝে মাঝে ফোনে অসুস্থতার কথা তুললে জানি না কী বলব, শুধু বলি চিকিৎসকের কাছে যেতে।

২০০০-এর দশকে প্রথম কিডনি রোগ ধরা পড়লে মা বাইদুতে (Baidu) খোঁজাখুঁজি করতেন। পরে বাইদুর বেশ কিছু চিকিৎসা বিজ্ঞাপন কেলেঙ্কারি সামনে আসে—স্পনসরড লিংকে অপ্রমাণিত থেরাপির খোঁজ পেয়ে এক কলেজছাত্রের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল। কখনো তিনি তিয়ানয়া ফোরাম ব্রাউজ করতেন, অন্য কিডনি রোগীদের চিকিৎসা ও চলাচলের অভিজ্ঞতা পড়তেন।

পরে উইচ্যাট, ডউইন, চিহু, জিয়াওহংশু—এগুলোই হয়ে ওঠে স্বাস্থ্য তথ্যের জন্য মায়ের মতো কোটি কোটি চীনার ঠিকানা। বিশেষত কোভিড লকডাউনের সময় এগুলো জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ওয়েলনেস টিপস শেয়ার এবং অ্যালগরিদমের মাধ্যমে একই রোগে ভোগা অন্যদের সঙ্গে সংযোগ ঘটে। হাজার হাজার চীনা চিকিৎসক এখন ইনফ্লুয়েঞ্জার হয়ে উঠেছেন—চর্ম সমস্যা থেকে হৃদরোগ নিয়ে তাঁরা ভিডিও পোস্ট করেন। এই প্ল্যাটফর্মগুলোতে ছড়ায় অপ্রমাণিত তথ্য, প্রশ্নবিদ্ধ প্রতিকার ও ওষুধের বিজ্ঞাপন।

উইচ্যাটে ইনফ্লুয়েঞ্জারদের কাছ থেকে দুর্বোধ্য সব খাদ্যবিধি শিখতেন মা। বাইদুর অ্যালগরিদম অনিচ্ছাকৃতভাবে ডায়াবেটিস নিয়ে নিবন্ধ দেখাত। আমি সতর্ক করতাম, কিন্তু বয়স্ক বাবা-মায়েদের মতো তিনিও ছিলেন অবিচল।

এআই চ্যাটবটের উত্থানে অনলাইন চিকিৎসা পরামর্শে নতুন অধ্যায় যোগ হয়েছে। কিছু গবেষণায় লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের চিকিৎসা জ্ঞানের দক্ষতার প্রমাণও মিলেছে। ২০২৩-এর এক গবেষণায় দেখা যায়, চ্যাটজিপিটি মার্কিন মেডিকেল লাইসেন্সিং পরীক্ষায় তৃতীয় বর্ষের মেডিকেল ছাত্রের পাসিং নম্বর পেয়েছে। গত বছর গুগল জানায়, তাদের ফাইন-টিউনড মেড-জেমিনি মডেল আরও ভালো করেছে। মেটার লামায় (Llama) প্রশিক্ষিত বিশেষায়িত মডেলও চমৎকার ফলাফল দিয়েছে।

দৈনন্দিন ক্লিনিক্যাল অনুশীলনের মতো কাজ—যেমন রোগ নির্ণয়—নিয়ে গবেষণা এআই সমর্থকদের উৎসাহিত করে। ২০২৪-এর এক প্রি-প্রিন্ট গবেষণায় জরুরি বিভাগের বাস্তব তথ্য ওপেনএআই-এর জিপিটি-৪ও (GPT-4o) ও ও১ (o1)-এ দেওয়া হয়। দুটোই চিকিৎসকদের চেয়ে ভালো রোগ নির্ণয় করে। অন্য পিয়ার-রিভিউড গবেষণায় চ্যাটবট জুনিয়র চিকিৎসকদের হারিয়েছে চোখের সমস্যা, পেটের লক্ষণ ও জরুরি কেস নির্ণয়ে। জুনে মাইক্রোসফট দাবি করল, চিকিৎসকের চেয়ে চার গুণ বেশি নির্ভুলতায় রোগ নির্ণয় করতে পারে তাদের এআই-চালিত ব্যবস্থা, যা “চিকিৎসা সুপারইন্টেলিজেন্সের পথ” তৈরি করেছে। অবশ্য গবেষকরা পক্ষপাতিত্ব ও হ্যালুসিনেশনের ঝুঁকিও তুলে ধরছেন—যাতে ভুল রোগ নির্ণয়, ভুল চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য বৈষম্য গভীর হতে পারে।

চীনা এলএলএম কোম্পানিগুলো যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্লা দিতে ছুটছে, তখন ডিপসিকই প্রথম সিলিকন ভ্যালির শীর্ষ মডেলের সমান সামগ্রিক দক্ষতায় পৌঁছায়। চিকিৎসা পরীক্ষাতেও এটি ভালো করেছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় ডিপসিকের আর১ (R1) ডায়াগনস্টিক রিজনিংয়ে ওপেনএআই-এর ও১-এর সমান বা ভালো পারফর্ম করেছে। তবে রেডিওলজি রিপোর্ট মূল্যায়নে এটি পিছিয়ে আছে।

সীমাবদ্ধতা উপেক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ব্যবহারকারীরা নিয়মিত চিকিৎসা পরামর্শের জন্য চ্যাটবটের দ্বারস্থ হচ্ছেন। ২০২৪ সালের কেএফএফ (KFF) জরিপে দেখা গেছে, প্রতি ছয়জন মার্কিন প্রাপ্তবয়স্কের একজন মাসে অন্তত একবার স্বাস্থ্য তথ্যের জন্য চ্যাটবট ব্যবহার করেন। রেডডিটে ব্যবহারকারীরা চ্যাটজিপিটির অদ্ভুত সব রোগ নির্ণয়ের গল্প শেয়ার করেন। চীনা সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষ নিজের, সন্তানের ও বাবা-মায়ের চিকিৎসার জন্য চ্যাটবটের পরামর্শ নিচ্ছেন বলে জানান।

জিয়াংসু প্রদেশের এক ইলেকট্রনিকস কারখানার শ্রমিক (গোপনীয়তার জন্য নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানালেন, মায়ের জরায়ুর ক্যান্সার ধরা পড়ার পর তিনি তিনটি চ্যাটবটের পরামর্শ নিয়েছিলেন—চিকিৎসক ঠিক বলেছেন কি না, তা যাচাই করতে। নিজের হে ফিভারের (hay fever) ওষুধ কিনতে তিনি ফার্মেসিতে ডিপসিকের পরামর্শ মতো ওষুধ নিয়েছেন, দোকানদারের পরামর্শের পরিবর্তে। তিনি বললেন, “মালিকরা সবসময় সবচেয়ে দামি ওষুধ গছিয়ে দিতে চান।”

চেংদু শহরের আলোকচিত্রী রিয়েল কুয়াং ডিপসিকের কাছে বাবা-মায়ের স্বাস্থ্য নিয়ে জানতে চান—বাবার গলার প্রদাহের চিকিৎসা, ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট নেওয়া উচিত কি না, মায়ের কাঁধের অস্ত্রোপচার করা উচিত কি না। “মানব চিকিৎসকরা এত ধৈর্যশীল নন বা বিস্তারিত চিন্তাপ্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করেন না,” বললেন কুয়াং। “ডিপসিক আমাদের বেশি যত্ন নেওয়ার অনুভূতি দেয়।”

মা বলেছেন, নেফ্রোলজিস্টের চেম্বারে প্রবেশ করলে তাঁর নিজেকে দণ্ডপ্রাপ্তির অপেক্ষায় থাকা স্কুলছাত্রীর মতো মনে হয়। প্রশ্ন করলেই চিকিৎসকের বিরক্তির ভয় পান। তাঁর সন্দেহ—চিকিৎসক রোগীর সুস্থতার চেয়ে রোগীর সংখ্যা ও প্রেসক্রিপশনের আয়কে বেশি গুরুত্ব দেন।

কিন্তু ড. ডিপসিকের চেম্বারে তিনি স্বচ্ছন্দ।

“ডিপসিক আমাকে সমান মনে করায়,” বলেন মা। “আমি কথোপকথন পরিচালনা করি, যা খুশি জিজ্ঞেস করতে পারি। ও আমাকে সবকিছুর গভীরে যেতে দেয়।”

ফেব্রুয়ারি থেকে কিডনির কার্যকারিতা, গ্লুকোজ মাত্রা, অসাড় আঙুল, ঝাপসা দৃষ্টি, অ্যাপল ওয়াচের রক্ত অক্সিজেন, কাশি, ঘুম থেকে উঠে ঘোর লাগা—সবই রিপোর্ট করেছেন এআইকে। খাবার, সাপ্লিমেন্ট ও ওষুধের পরামর্শ চেয়েছেন।

“পিকান বাদাম কি আমার জন্য উপযুক্ত?” এপ্রিলে জিজ্ঞেস করেন। ডিপসিক পুষ্টিগুণ বিশ্লেষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি চিহ্নিত করে পরিমাণ সুপারিশ করল।

“আমার প্রতিস্থাপিত কিডনির আল্ট্রাসাউন্ড রিপোর্ট,” টাইপ করে দলিল আপলোড করলেন। ডিপসিক চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করল—নতুন ওষুধ এবং শীতকালীন লাউয়ের স্যুপের মতো পথ্য সুপারিশ করল।

“আমার বয়স ৫৭, কিডনি প্রতিস্থাপনের পর। সকাল ৯টা ও রাত ৯টায় ট্যাক্রোলিমাস [ইমিউনোসাপ্রেস্যান্ট] নিই। ওজন ৩৯.৫ কেজি। রক্তনালিকা শক্ত ও নাজুক, কিডনিতে রক্ত সঞ্চালন অপ্রতুল। এটা আজকের খাদ্যাভ্যাস। শক্তি ও পুষ্টিগুণ বিশ্লেষণে সাহায্য করুন। ধন্যবাদ!” তারপর তিনি দিনের খাদ্যতালিকা দিলেন। ডিপসিক প্রোটিন কমাতে এবং আঁশ বাড়াতে পরামর্শ দিল।

প্রতি প্রশ্নের জবাব ছিল আত্মবিশ্বাসী—বুলেট পয়েন্ট, ইমোজি, তালিকা ও ফ্লোচার্টের মিশেল। ধন্যবাদ জানালে উৎসাহ জোগাত।

“আপনি একা নন।”

“আপনার উন্নতিতে আমি এত খুশি!”

কখনো তারা বা চেরি ব্লসম (বসন্তের ফুল) ইমোজি দিয়ে শেষ করত।

“ডিপসিক চিকিৎসকদের চেয়ে অনেক ভালো,” একদিন আমাকে টেক্সট করলেন মা।

মাসের পর মাস মায়ের ডিপসিকের প্রতি নির্ভরশীলতা বাড়ে। চ্যাটবট বারবার বাস্তব চিকিৎসক দেখানোর কথা মনে করিয়ে দিলেও, তিনি তার পরামর্শে নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করতে শুরু করেন। মার্চে ইমিউনোসাপ্রেস্যান্ট কমাতে সুপারিশ করল, তিনি কমালেন। কিডনি সুরক্ষায় সামনের দিকে ঝুঁকে না বসতে বলল, তিনি সোজা হয়ে বসতে লাগলেন। তারপর লোটাস রুট স্টার্চ ও গ্রিন টি এক্সট্র্যাক্ট সুপারিশ করল, তিনি দুটোই কিনলেন।

এপ্রিলে নতুন কিডনি কত দিন টিকবে জিজ্ঞেস করেন। তিন থেকে পাঁচ বছরের সময়সীমা অনুমান করলে উদ্বেগে তলিয়ে যান তিনি।

তাঁর সম্মতিতে ডিপসিকের কথোপকথনের অংশ দুই মার্কিন নেফ্রোলজিস্টের সঙ্গে শেয়ার করি।

চিকিৎসকদের মতে ডিপসিকের জবাব ভুলে ভরা। ড. জোয়েল টপফ, মিশিগানের ওকল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নেফ্রোলজিস্ট ও সহযোগী ক্লিনিক্যাল অধ্যাপক, জানালেন রক্তশূন্যতা চিকিৎসার এক পরামর্শ—ইরিথ্রোপয়েটিন হরমোন ব্যবহার—ক্যান্সার ও অন্যান্য জটিলতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। কিডনি কার্যকারিতা উন্নয়নের আরও কয়েকটি চিকিৎসা ডিপসিকের সুপারিশ ছিল অপ্রমাণিত, সম্ভাব্য ক্ষতিকর, অনাবশ্যক বা “এক ধরনের মনগড়া কথা”।

কিডনি কত দিন টিকবে—এই প্রশ্নের জবাবে তিনি কী বলতেন? “আমি সাধারণত কম নির্দিষ্ট থাকি,” বললেন তিনি। “কত দিন বাকি তা বলার পরিবর্তে দুই বা পাঁচ বছরে কত ভাগ রোগীর ডায়ালিসিসে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তা নিয়ে কথা বলি।”

বোস্টনের বেথ ইসরায়েল ডিকোনেস মেডিকেল সেন্টারের নেফ্রোলজিস্ট ও হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের সহযোগী অধ্যাপক ড. মেলানি হোনিগ জানালেন, ডিপসিকের খাদ্য পরামর্শ মোটামুটি যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু এটি সম্পূর্ণ ভুল রক্ত পরীক্ষার সুপারিশ করেছে এবং মায়ের আসল রোগ নির্ণয়ের সঙ্গে অত্যন্ত বিরল অন্য একটি কিডনি রোগ গুলিয়ে ফেলেছে।

“প্রকৃতপক্ষে এটা এক ধরনের আবোলতাবোল বকবকানি,” বলেন হোনিগ। “যারা জানে না—তাদের পক্ষে কোন অংশটা হ্যালুসিনেশন আর কোনটা সঠিক পরামর্শ, তা বোঝা কঠিন।”

গবেষকরা দেখেছেন, চ্যাটবটের চিকিৎসা পরীক্ষার দক্ষতা বাস্তবে কাজে আসে না। পরীক্ষায় লক্ষণগুলো স্পষ্টভাবে দেওয়া থাকে। কিন্তু বাস্তবে রোগী প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে সমস্যা বর্ণনা করেন। তাঁরা জানেন না কোন লক্ষণ প্রাসঙ্গিক, সঠিক চিকিৎসা পরিভাষাও তাঁরা ব্যবহার করেন না। রোগ নির্ণয়ে পর্যবেক্ষণ, সহানুভূতি ও ক্লিনিক্যাল বিচক্ষণতা প্রয়োজন।

এ বছর ‘নেচার মেডিসিন’-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় গবেষকরা এমন এআই এজেন্ট তৈরি করেন যা রোগীর মতো কথা বলে এবং ১২টি বিশেষত্বে এলএলএম-এর ক্লিনিক্যাল সামর্থ্য পরীক্ষা করে। সব এলএলএম পরীক্ষায় মানুষের চেয়ে অনেক খারাপ করেছে। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের পিএইচডি শিক্ষার্থী ও গবেষণার প্রধান লেখক শ্রেয়া জোহরি ‘রেস্ট অফ ওয়ার্ল্ড’কে জানালেন, এআই মডেলগুলো প্রশ্ন করায় ভালো ছিল না। কারও চিকিৎসা ইতিহাস বা লক্ষণ কথোপকথনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকলে সংযোগ স্থাপনেও এগুলো পিছিয়ে ছিল। “এলএলএম নিয়ে একটু সন্দেহের চোখে দেখা উচিত,” জোহরি বলেন।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বাধীন অন্য এক প্রি-প্রিন্ট গবেষণায় সাধারণ মানুষকে এলএলএম বা প্রথাগত পদ্ধতি—যেমন সার্চ ইঞ্জিন বা জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ওয়েবসাইট—ব্যবহার করে স্বাস্থ্য সমস্যা ও পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ণয় করতে বলা হয়। এলএলএম ব্যবহারকারীরা সঠিক উত্তরে পৌঁছাতে খুব একটা ভালো করেননি।

অক্সফোর্ডের পিএইচডি প্রার্থী ও গবেষণার প্রধান লেখক অ্যান্ড্রু বিন জানালেন, পরীক্ষার সময় ব্যবহারকারীরা প্রম্পটে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ বাদ দেন বা চ্যাটবট কয়েকটি বিকল্প সুপারিশ করলে সঠিক উত্তর চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হন। মানুষ ভুল তথ্য দিলেও লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল তাতে সায় দেওয়ার প্রবণতা দেখায়। “বিশেষজ্ঞ ছাড়া এখানে অনেক ঝুঁকি আছে,” বলেন তিনি।

মায়ের সঙ্গে ডিপসিকের বন্ধন গড়ে ওঠার এই সময়ে চীনজুড়ে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীরা লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলকে সাদরে গ্রহণ করছেন।

জানুয়ারিতে ডিপসিক আর১ (R1) রিলিজের পর শত শত হাসপাতাল মডেলটি তাদের প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করে। এআই-সমৃদ্ধ ব্যবস্থা প্রাথমিক অভিযোগ সংগ্রহ, চার্ট তৈরি ও রোগ নির্ণয় সুপারিশে সাহায্য করে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্বে বড় হাসপাতালগুলো রোগীর তথ্য দিয়ে নিজেদের বিশেষায়িত মডেল প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। সিচুয়ান প্রদেশের এক হাসপাতাল “ডিপজয়েন্ট” চালু করেছে—যা অর্থোপেডিক্সের জন্য সিটি বা এমআরআই স্ক্যান বিশ্লেষণ করে অস্ত্রোপচার পরিকল্পনা তৈরি করে। বেইজিংয়ের এক হাসপাতাল “স্টোন চ্যাট এআই” তৈরি করেছে, যা মূত্রনালির পাথর নিয়ে রোগীদের প্রশ্নের জবাব দেয়।

“আগে একজন চিকিৎসক একটি ক্লিনিকে কাজ করতে পারতেন। এখন একজন চিকিৎসক একসঙ্গে দুই-তিনটি ক্লিনিক চালাতে পারবেন।”

প্রযুক্তি শিল্প এখন স্বাস্থ্যসেবাকে এআই অ্যাপ্লিকেশনের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে দেখছে। ডিপসিক নিজেই চিকিৎসা তথ্যে মন্তব্য দেওয়ার জন্য ইন্টার্ন নিয়োগ শুরু করেছে—উদ্দেশ্য মডেলের চিকিৎসা জ্ঞান উন্নয়ন ও হ্যালুসিনেশন কমানো। আলিবাবা মে মাসে ঘোষণা দেয় তাদের স্বাস্থ্যসেবা-কেন্দ্রিক চ্যাটবট, যা কোয়েন (Qwen) মডেলের ওপর প্রশিক্ষিত, চীনের চিকিৎসা যোগ্যতা পরীক্ষায় ১২টি বিষয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। অপর শীর্ষ চীনা এআই স্টার্টআপ ‘বাইচুয়ান এআই’ মানব চিকিৎসকের অভাব দূর করতে ‘কৃত্রিম সাধারণ বুদ্ধিমত্তা’ (AGI) ব্যবহারের লক্ষ্য নিয়েছে। “যখন আমরা একজন চিকিৎসক তৈরি করতে পারব, তখনই এজিআই অর্জন করব,” প্রতিষ্ঠাতা ওয়াং শিয়াওচুয়ান এক চীনা সংবাদমাধ্যমে বলেন। বাইচুয়ান এআই সাক্ষাৎকারের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে।

দেশের জনপ্রিয়তম অ্যাপগুলোতে নবীন “এআই চিকিৎসক” দেখা যাচ্ছে। শর্ট-ভিডিও অ্যাপ ডউইনে চিকিৎসক ইনফ্লুয়েঞ্জারদের প্রোফাইল ছবিতে ট্যাপ করে তাঁদের এআই অবতারের সঙ্গে কথা বলতে পারেন ব্যবহারকারীরা। পেমেন্ট অ্যাপ অ্যালিপেতেও চিকিৎসা সুবিধা রয়েছে—বিনামূল্যে এআই অনকোলজিস্ট, এআই শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ, এআই ইউরোলজিস্ট আর এআই অনিদ্রা বিশেষজ্ঞ, যিনি ভোর ৩টায়ও জেগে থাকলে কলে পাওয়া যান। এই এআই অবতাররা মৌলিক চিকিৎসা পরামর্শ, চিকিৎসা রিপোর্ট ব্যাখ্যা ও বাস্তব চিকিৎসকের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুকিংয়ে সাহায্য করেন।

হাংচৌয়ের এক গাইনোকোলজিস্ট ড. তিয়ান জিশুন অ্যালিপের ২০০ এআই চিকিৎসকের বহর গড়তে তাঁর ব্যক্তিত্ব ধার দিয়েছেন। তিয়ান বললেন, তিনি এআই বিপ্লবের অংশ হতে চেয়েছেন, যদিও স্বীকার করেন তাঁর ডিজিটাল প্রতিরূপ অপূর্ণ। “এটা প্রথম আইফোনের মতো,” বললেন তিনি। “ভবিষ্যৎ কেমন হবে কেউ জানে না।”

এআই স্বাস্থ্যসেবা স্টার্টআপ ‘জুওশোউ ইশেং’-এর প্রতিষ্ঠাতা ঝ্যাং চাও আলিবাবার কোয়েন মডেলের ওপর ভিত্তি করে এআই প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা চিকিৎসক তৈরি করেছেন। প্রায় ৫ লাখ ব্যবহারকারী ওই বটের সঙ্গে কথা বলেছেন, যার বেশিরভাগই উইচ্যাটের মিনি অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে। ছোটখাটো চর্মরোগ, সন্তানের অসুস্থতা বা যৌনরোগ নিয়ে জিজ্ঞেস করেছেন মানুষ।

চীন “এআই চিকিৎসকদের” প্রেসক্রিপশন দেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, কিন্তু কী বলা যাবে তার ওপর নজরদারি কম। কোম্পানিগুলোকে নিজেদের নৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, ঝ্যাং তাঁর বটকে শিশুদের ওষুধ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্নের জবাব দিতে নিষেধ করেছেন। দলের মানুষদের দিয়ে সন্দেহজনক পরামর্শ খোঁজার ব্যবস্থাও করেছেন। ঝ্যাং বললেন, তিনি বটের পারফরম্যান্সে সামগ্রিকভাবে আত্মবিশ্বাসী। “চিকিৎসায় কোনো সঠিক উত্তর নেই,” বলেন তিনি। “বিষয় হলো এটা ব্যবহারকারীদের কতটা সাহায্য করতে পারে।”

এআই চিকিৎসকরা অফলাইন ক্লিনিকেও আসছেন। এপ্রিলে চীনা স্টার্টআপ ‘সিনাই এআই’ সৌদি আরবের এক হাসপাতালে এআই চিকিৎসক সেবা চালু করে। চিকিৎসকের মতো প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে প্রশিক্ষিত এই বট ট্যাবলেটের মাধ্যমে রোগীদের সঙ্গে কথা বলে, ল্যাব পরীক্ষার অর্ডার করে, রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা সুপারিশ করে। তারপর একজন মানব চিকিৎসক সেই পরামর্শ পর্যালোচনা করেন। সিনাই এআই-এর চিফ ডেটা অফিসার গ্রেগ ফেং বললেন, এটি প্রায় ৩০টি শ্বাসযন্ত্রের রোগের চিকিৎসা নির্দেশনা দিতে পারে।

ফেং বললেন, এআই মানুষের চেয়ে বেশি মনোযোগী ও সহানুভূতিশীল। রোগীর স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য এটি নিজের লিঙ্গ পরিবর্তন করতে পারে। আর মানব চিকিৎসকের বিপরীতে যতক্ষণ খুশি প্রশ্নের জবাব দিতে পারে। যদিও একে মানুষের তত্ত্বাবধানে থাকতে হয়, তবুও এটি দক্ষতা বাড়াতে পারে। “আগে একজন চিকিৎসক একটি ক্লিনিকে কাজ করতে পারতেন,” বলেন ফেং। “এখন একজন চিকিৎসক একসঙ্গে দুই-তিনটি ক্লিনিক চালাতে পারবেন।”

উদ্যোক্তারা দাবি করছেন এআই হাসপাতালের ভিড়, চিকিৎসাকর্মীর অভাব, গ্রামীণ ও শহরের মানের চিকিৎসা বৈষম্য—এসব স্বাস্থ্যসেবার প্রবেশাধিকার-জনিত সমস্যার সমাধান করতে পারে। চীনা সংবাদমাধ্যমে তিব্বতীয় মালভূমির মতো পিছিয়ে পড়া অঞ্চলে এআই চিকিৎসা সহায়তার খবর প্রকাশিত হয়েছে। “ভবিষ্যতে ছোট শহরের বাসিন্দারা এআই মডেলের কল্যাণে ভালো স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সুবিধা উপভোগ করতে পারবেন,” বললেন উহান বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ওয়েই লিজিয়া। তাঁর সম্প্রতি ‘জার্নাল অফ হেলথ ইকোনমিক্স’-এ প্রকাশিত গবেষণায় পাওয়া গেছে, এআই সহায়তা অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা কমাতে এবং চিকিৎসকদের বিশেষত্বের বাইরের ক্ষেত্রে পারফরম্যান্স বাড়াতে পারে। “আপনার মাকে,” বললেন তিনি, “আর বড় শহরে চিকিৎসা নিতে যেতে হবে না।”

তবে অন্য গবেষকরা সম্মতি, জবাবদিহিতা ও পক্ষপাতিত্ব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন—যা আসলে স্বাস্থ্য বৈষম্য আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। মার্চে ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় গবেষকরা বুকের এক্স-রে বিশ্লেষণে ব্যবহৃত একটি মডেল মূল্যায়ন করেন। মানব রেডিওলজিস্টের তুলনায় সুবিধাবঞ্চিত গোষ্ঠী—নারী, কৃষ্ণাঙ্গ রোগী, ৪০ বছরের কম বয়সীদের—জীবনঘাতী রোগ ধরতে এই মডেল পিছিয়ে ছিল।

“এআই চীন বা বিশ্বের অন্যান্য অংশে স্বাস্থ্য বৈষম্য কমাবে কি না, তা নিয়ে আমি অত্যন্ত সন্দিহান,” বললেন টেক্সাস এঅ্যান্ডএম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ বিভাগের অধ্যাপক লু তাং, যিনি চিকিৎসা এআই নীতিশাস্ত্র নিয়ে গবেষণা করেন। “বেইজিং বা সাংহাইতে উন্নত এআই মডেল ছোট পাহাড়ি গ্রামের এক কৃষকের জন্য ভালো কাজ নাও করতে পারে।”

মাকে ফোন করে মার্কিন নেফ্রোলজিস্টরা ডিপসিকের ভুল সম্পর্কে যা বলেছিলেন তা জানালে তিনি বললেন, তিনি জানেন ডিপসিক বিপরীতমুখী পরামর্শ দিয়েছে। ইন্টারনেটের সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা তথ্যে প্রশিক্ষিত চ্যাটবট যে কোনো পরম সত্য বা অতিমানবিক কর্তৃপক্ষ নয়, তা তিনি বোঝেন। তিনি সুপারিশ করা লোটাস বীজের স্টার্চ খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন।

কিন্তু ডিপসিক থেকে পাওয়া যত্ন চিকিৎসা জ্ঞানের বাইরেও যায়—এর অবিচল উপস্থিতিই তাঁকে সান্ত্বনা দেয়।

মনে পড়ে একদিন জানতে চেয়েছিলাম, কেন ইংরেজি ব্যাকরণ নিয়ে—যা তিনি প্রায়ই ডিপসিককে জিজ্ঞেস করেন—আমাকে জিজ্ঞেস করেন না। “তুমি নিশ্চয়ই বিরক্ত হবে,” জবাব দিলেন তিনি। “কিন্তু ডিপসিক বলবে, ‘এ নিয়ে আরও কথা বলি।’ এতে আমি সত্যিই খুশি হই।”

আমাদের এক-সন্তান নীতির প্রজন্ম বড় হয়েছে, আর আমাদের বাবা-মায়েরা চীনের দ্রুত বর্ধমান বয়োজ্যেষ্ঠ জনসংখ্যায় যোগ দিচ্ছেন। সর্বজনীন বয়োজ্যেষ্ঠ যত্ন কাঠামো এখনো তৈরি হয়নি, অথচ আমরা অনেকেই বৃদ্ধ বাবা-মায়ের থেকে দূরে, নিজেদের প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের চ্যালেঞ্জ মেটাতে ব্যস্ত। তবুও মা একবারও বাড়ি এসে দেখাশোনা করতে বলেননি।

তিনি বোঝেন, এক নারীর জন্য বাড়ি ছেড়ে বড় জগতে পা দেওয়া মানে কী। ১৯৮০-এর দশকে তিনি সেটাই করেছিলেন—গ্রামের পরিবার, যেখানে তিনি বাবা-মা ও ছোট ভাইয়ের জন্য রান্নাবান্নাসহ সব কাজ করতেন, তা ছেড়ে শিক্ষক প্রশিক্ষণ স্কুলে গিয়েছিলেন। তিনি আমার স্বাধীনতাকে শ্রদ্ধা করেন, কখনো কখনো একটু বেশিই। সপ্তাহে একবার বা দুইবার ফোন করি। তিনি প্রায়ই ফোন করেন না, পাছে আমাকে কোনো ব্যস্ত সময়ে বিরক্ত করে ফেলেন—হয়তো যখন কাজ করছি বা বন্ধুদের সঙ্গে আছি।

কিন্তু সবচেয়ে বুঝদার বাবা-মায়েরও কারও ওপর ভরসা রাখতে হয়। আমার বয়সী এক বন্ধু ওয়াশিংটন ডিসিতে থাকেন, যিনি চীন থেকে অভিবাসী, সম্প্রতি তাঁর মা ও ডিপসিকের বন্ধুত্বের বিষয়টি আবিষ্কার করেছেন। পূর্ব চীনের নানজিং শহরে থাকা ৬২ বছর বয়সী মা বিষণ্নতা ও উদ্বেগে ভোগেন। ব্যক্তিগত থেরাপি খুব ব্যয়বহুল, তাই তিনি পারিবারিক দৈনন্দিন সংগ্রামগুলো ডিপসিককে খুলে বলেন। ডিপসিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ ও করণীয় তালিকা দিয়ে জবাব দেয়।

“মা যখন খুব হতাশ ও উদ্বিগ্ন ছিলেন, তখন প্রতিদিন ফোন করতাম। কিন্তু আমাদের মতো তরুণদের পক্ষে এটা চালিয়ে যাওয়া কঠিন,” বললেন আমার বন্ধু। “এআই-এর ভালো দিক হলো আপনি যেকোনো সময় যা খুশি বলতে পারেন। সময়ের ব্যবধান (time difference) নিয়ে ভাবতে হবে না, বা আমার জবাবের অপেক্ষায় থাকতে হবে না।”

“আমাদের মতো তরুণদের পক্ষে এটা চালিয়ে যাওয়া কঠিন,” বললেন আমার বন্ধু।

৩৬ বছর বয়সী উদ্যোক্তা ঝ্যাং জিয়ানশেং আলজেইমার্স রোগীদের সঙ্গে কথা বলতে পারে এমন এআই-চালিত ট্যাবলেট তৈরি করেছেন। তিনি বললেন, বাবা-মায়ের দাদিকে দেখাশোনার সংগ্রাম তিনি দেখেছেন। আলজেইমার্স রোগীর আচরণ পরিবর্তনে বিরক্ত না হওয়া কঠিন, ব্যাখ্যা করলেন তিনি, কিন্তু এআই অসীম ধৈর্যশীল। “এআইর কোনো অনুভূতি নেই,” বললেন তিনি। “এটি বয়োজ্যেষ্ঠদের উৎসাহ, প্রশংসা ও সান্ত্বনা দিতেই থাকবে।”

মা এখনও স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বিগ্ন হলে ডিপসিকের কাছে যান। জুনের শেষে নিজ শহরের ছোট হাসপাতালে পরীক্ষায় তাঁর শ্বেত রক্তকণিকার সংখ্যা কম ধরা পড়েছিল। ডিপসিককে জানালে ফলো-আপ পরীক্ষার সুপারিশ পান। স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেলে তিনিও সেই অনুযায়ী পরীক্ষার নির্দেশ দেন।

পরদিন কথা হলো। আমার এখানে রাত ৮টা, তাঁর ওখানে সকাল ৮টা। হাংচৌয়ের নেফ্রোলজিস্টকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দেখাতে বললাম।

তিনি আপত্তি জানালেন, ড. ডিপসিকই যথেষ্ট বলে জোর দিলেন। “ওখানে এত ভিড়,” তিনি গলা উঁচিয়ে বললেন। “হাসপাতালের কথা ভাবলেই মাথা ধরে যায়।”

শেষপর্যন্ত তিনি চিকিৎসক দেখাতে রাজি হন। কিন্তু যাওয়ার আগে হাড়ের মজ্জার কার্যকারিতা ও জিংক সাপ্লিমেন্ট নিয়ে ডিপসিকের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা চালিয়ে যান। “ডিপসিকের কাছে সারা বিশ্বের তথ্য আছে,” তিনি যুক্তি দেখালেন। “এটি আমাকে সব সম্ভাবনা ও বিকল্প দেখায়। আর আমি সেখান থেকে বেছে নিতে পারি।”

ডিপসিক নিয়ে আমাদের আগের এক কথোপকথনের কথা মনে পড়ল। “যখন বিভ্রান্ত হই, কাউকে জিজ্ঞেস করার নেই, যাকে বিশ্বাস করতে পারি এমন কেউ নেই, তখন উত্তরের জন্য এর কাছে যাই,” বলেছিলেন তিনি। “টাকা খরচ করতে হয় না। লাইনে দাঁড়াতে হয় না। কিছুই করতে হয় না।”

তিনি আরও যোগ করলেন, “যদিও এটি আমাকে সম্পূর্ণ বা বৈজ্ঞানিক উত্তর দিতে পারে না, অন্তত একটা উত্তর তো দেয়।”

প্রাসঙ্গিক