skip to content

গুলবাহার

ব্রিটেনের উপকূল: ভাঙনের ঝুঁকি ও বিকল্প ব্যবস্থাপনা

• ৪ মিনিট

সম্প্রতি যুক্তরাজ্যে প্রবল ঝড়ে উপকূলীয় সড়কের একটি বড় অংশ ভেঙে সমুদ্রে তলিয়ে গেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে এতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে উপকূলবিজ্ঞানীদের কাছে ঘটনাটি মোটেও অপ্রত্যাশিত ছিল না।

দক্ষিণ ডেভনের টরক্রস ও স্ল্যাপটনের মধ্যবর্তী এ৩৭৯ (A379) সড়কের একটি বিশাল অংশ ধসে পড়েছে। প্রায় ২০০ মিটার সড়ক সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে এবং পাশের একটি গাড়ি পার্কিং এলাকাও ধ্বংস হয়ে গেছে। প্রকৌশলীরা বলছেন, ইস্পাতের বেষ্টনীযুক্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও বারবার আছড়ে পড়া ঢেউয়ের আঘাত সইতে পারেনি।

সড়কটি মূলত নুড়িপাথরের তৈরি একটি বাঁধ বা ‘শিঙ্গল ব্যারিয়ার বিচ’-এর ওপর দিয়ে গেছে। এর একপাশে সমুদ্র এবং অন্যপাশে স্ল্যাপটন লে (Slapton Ley) নামের একটি স্বাদু পানির হ্রদ। সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ঝড়ে পলি সরে যাওয়ায় সৈকতটি ক্রমশ সরু ও খাড়া হয়ে উঠেছে।

সৈকতের সামনের অংশে পলি কমে যাওয়ায় ঢেউ এখন সরাসরি সড়কের কাছে এসে আছড়ে পড়ছে এবং রাস্তার কিনারা ভাঙতে শুরু করেছে। এই স্থানের মূল সমস্যা কোনো একক বা নির্দিষ্ট ভয়াবহ ঝড় নয়; বরং ধীরে ধীরে সৈকতের পলি সরে যাওয়া এবং এর প্রাকৃতিক পুনর্বিন্যাসই রাস্তাটিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।

সাধারণত প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে সমুদ্রবাঁধ বা পাথরের ব্লকের মতো কঠিন ও কাঠামোগত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এগুলো হয়তো কিছুদিনের জন্য সুরক্ষা দিতে পারে, কিন্তু ধেয়ে আসা ঢেউয়ের শক্তি কমাতে পারে না। সেই শক্তি বা তোড় কেবল বাধাপ্রাপ্ত হয়ে অন্যদিকে সরে যায় এবং প্রায়শই উপকূলের অন্য কোনো অংশে ভাঙন ত্বরান্বিত করে। অর্থাৎ ঝুঁকি দূর হয় না, কেবল স্থানান্তরিত হয়।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ঝড়ের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে মানুষের তৈরি এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তাল মেলাতে পারছে না। এগুলো মূলত সমস্যা সমাধানে কিছুটা বাড়তি সময় দেয় মাত্র, কিন্তু স্থায়ী সুরক্ষা দিতে পারে না।

উপকূল ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্তে যে বিজ্ঞান ব্যবহার করা হয়, তাতেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কম্পিউটার মডেল ভবিষ্যতে সৈকতের পরিবর্তন সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে, কিন্তু বাস্তব উপকূল অনেক জটিল এবং তা ক্রমাগত বদলায়। তথ্যের সামান্য হেরফেরেই মডেলের ফলাফলে বড় পার্থক্য দেখা দিতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণকে কঠিন করে তোলে।

তাই প্রাকৃতিকভাবে উপকূল রক্ষার দাবি ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। বালিয়াড়ি তৈরি, ম্যানগ্রোভ বনায়ন বা জলাভূমি পুনরুদ্ধারের মতো পদক্ষেপগুলো ঢেউয়ের শক্তি শোষণের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও কার্বন সংরক্ষণে সাহায্য করে। প্রাকৃতিক পরিবেশ পরিস্থিতির সঙ্গে অভিযোজিত হতে পারে বা মানিয়ে নিতে পারে, যা কৃত্রিম কঠিন অবকাঠামো পারে না।

তবে এগুলো কোনো চটজলদি সমাধান নয়। এ ধরনের ব্যবস্থা গড়ে উঠতে সময় ও জায়গার প্রয়োজন হয় এবং এর সুরক্ষার ধরনও ভিন্ন। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাকৃতিক ব্যবস্থা ঢেউয়ের শক্তি কমাতে পারলেও চরম দুর্যোগের ক্ষেত্রে বন্যা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কিছুটা সীমিত।

অন্যদিকে জনসাধারণের প্রত্যাশা প্রায়ই বাস্তবতার উল্টো। যুক্তরাজ্যে নীতিগতভাবে প্রাকৃতিক উপায়ের জনপ্রিয়তা থাকলেও, ঝড়ের হুমকি এলে মানুষ দৃশ্যমান ও কঠোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাই দাবি করে—তাৎক্ষণিক সুরক্ষার আশায়, যদিও তা স্থায়ী নয়।

এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে অর্থনীতির জটিল সমীকরণ।

বন্যা ও ভাঙনের ঝুঁকি মানুষের বসবাস ও বিনিয়োগের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। বন্যাপ্রবণ এলাকার মানচিত্র দেখে মানুষ সাধারণত অন্য জায়গায় জমি বা বাড়ি খোঁজেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সম্পত্তির দামও কমে যায়। বিমা খরচও সেখানে বেশি। কিন্তু এই মানচিত্র বা পূর্বাভাসকে মানুষ ধ্রুব সত্য বলে ধরে নেয়, যদিও তা সবসময় সঠিক হয় না। বড় কোনো ঝড়ের পর হঠাৎ করেই এসব এলাকার সম্পত্তির দাম পড়ে যায়।

বাস্তবে এর মানে হলো, যেখানে বিজ্ঞান ঝুঁকির কথা বলছে, প্রায়ই সেখানেই অর্থলগ্নি ও উন্নয়নমূলক কাজ বেশি কেন্দ্রীভূত থাকছে।

সতর্কবার্তা

স্ল্যাপটনের পরিস্থিতি বিষয়টি একদম স্পষ্ট করে দিয়েছে। প্রতি ঝড়ের পর বারবার একই সড়ক পুনর্নির্মাণ করা অবকাঠামোগত বা আর্থিকভাবে কোনো বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নয়।

কিছু উপকূলীয় পরিকল্পনায় ইতোমধ্যে এই কঠিন বাস্তবতা মেনে নেওয়া হয়েছে। একে বলা হচ্ছে ‘পরিচালিত পুনর্বিন্যাস’ (Managed Realignment) বা ‘সক্রিয় হস্তক্ষেপ না করা’র নীতি। এর অর্থ হলো—উপকূলকে প্রাকৃতিকভাবে ভেতরে সরে আসতে দেওয়া এবং কাদাভাটি বা জলাভূমির মতো প্রাকৃতিক বাফার জোন তৈরি করা। কিছু জায়গায় ক্রমাগত উন্মুক্ত উপকূল রক্ষা করার চেয়ে উন্নয়ন কাজ বা বসতি ভেতরে সরিয়ে নেওয়াই বেশি নিরাপদ ও সাশ্রয়ী হতে পারে।

তবে এই সিদ্ধান্তগুলোর কঠিন নেতিবাচক দিকও রয়েছে।

সড়ক নতুন করে ঘুরিয়ে নিতে হতে পারে। কৃষিজমি বন্যায় তলিয়ে যেতে পারে। বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। পুরনো বাস্তুতন্ত্র ধ্বংসের আগে নতুন আবাসস্থল গড়ে নাও উঠতে পারে। নদী বা সমুদ্রতীরের দামী সম্পত্তি কিংবা অবসর যাপনের বাড়িঘর—কাকে সুরক্ষা দেওয়া হবে আর কাকে হবে না, সেই সিদ্ধান্ত দ্রুতই রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়।

বিকল্পটি হলো একটি ব্যয়বহুল চক্র—ক্ষতি, মেরামত ও পুনর্নির্মাণ, যার সুফল বা সুবিধা প্রতিবারই কমতে থাকে।

স্ল্যাপটনের ঘটনা কেবল প্রকৌশলগত ব্যর্থতা নয়। এটি মনে করিয়ে দেয় যে, উপকূল স্বাভাবিকভাবেই গতিশীল, একে সবসময় এক জায়গায় আটকে রাখা যায় না। সমুদ্রবাঁধ হয়তো সাময়িক সময় দিতে পারে, প্রকৃতি আঘাত কিছুটা সইতে পারে, আর সঠিক তথ্য সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। কিন্তু কোনো কিছুই ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করতে পারে না।

দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব বা টেকসই ব্যবস্থার মূল কথা হলো উপকূলের আসল আচরণ মেনে নেওয়া। কোথায় বাঁধ দেব, কোথায় মানিয়ে নেব, আর কোথায় পিছিয়ে এসে প্রকৃতিকে তার মতো চলতে দেব—সে বিষয়ে বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত নেওয়াই হলো বুদ্ধিমানের কাজ।