skip to content

গুলবাহার

ফুটবলের ভেতরেই রোনালদোর ফুটবল-উত্তর যাত্রা

• 6 min read

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এখন ফুটবলের ভেতরে থেকেও যেন ফুটবল-পরবর্তী এক জীবন কাটাচ্ছেন। এখন মাঠে খেলার চেয়ে না খেললেই তিনি বেশি আলোচনায় থাকেন।

একটু ভেবে বলুন তো, সর্বশেষ কবে রোনালদোর কোনো স্মরণীয় গোল দেখেছেন?

আমি সর্বশেষ যে গোলটি দেখেছি, সেটি ছিল হামবুর্গে। ২০২৪ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের কোয়ার্টার ফাইনাল; পর্তুগাল ও ফ্রান্সের মধ্যে ১২০ মিনিটের নিরুত্তাপ ড্র। ম্যাচ টাইব্রেকারে গড়ালে দুই দলের সমর্থকরাই যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন। বাকি দর্শকদের জন্য টাইব্রেকারের ‘সাডেন ডেথ’ ছিল এক ধরনের মুক্তি। টুর্নামেন্টে রোনালদোর একমাত্র গোলটি এভাবেই এসেছিল। এর আগের রাউন্ডে স্লোভাকিয়ার বিপক্ষে আরেকটি টাইব্রেকারে তিনি দলের হয়ে গোল করেছিলেন। সেটি ছিল তার ব্যক্তিগত স্বস্তি—নির্ধারিত সময়ে পেনাল্টি মিস করে যে নাটকীয় কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন, তারই যেন প্রায়শ্চিত্ত ছিল ওই গোল।

হামবুর্গে রোনালদো তার রান-আপ নিলেন, গোল করলেন এবং ভালো কিছুর আশা করলেন। কিন্তু ফ্রান্সের খেলোয়াড়রা ছিলেন নিখুঁত। জোয়াও ফেলিক্স—যিনি এখন আল নাসরেই রোনালদোর সতীর্থ—তিনি ব্যর্থ হলেন, আর পর্তুগাল বিদায় নিল।

পরিসংখ্যান বলছে, এরপর রোনালদো ৫৫টি গোল করেছেন। এর কিছু কিছুর গুরুত্ব অবশ্যই আছে। গত গ্রীষ্মে নেশনস লিগের সেমিফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে জয়সূচক গোলটি ছিল তার। এরপর ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে খেলা গড়ালে স্পেনকে (বর্তমান ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন) আবারও টাইব্রেকারে হারায় পর্তুগাল। অবশ্য রোনালদো সেখানে পেনাল্টি নিতে পারেননি; ৮৮তম মিনিটে গোনসালো রামোস তার বদলি হিসেবে নেমেছিলেন।

নেশনস লিগের সমালোচকরা হয়তো এই সাফল্যকে খাটো করে দেখবেন। তাদের মতে, এই প্রতিযোগিতা বর্ষপঞ্জি অহেতুক ভারী করে এবং ‘ফুটবলের আধিক্য’ বা খেলার মান কমার ধারণাটিকে আরও পোক্ত করে। খেলোয়াড়দের ক্লান্তিতে ফুটবলের জৌলুস কমে, ম্যাচ ও গোলগুলো আর আগের মতো স্মরণীয় হয় না। এটি একটি সাধারণ মতামত এবং এর পেছনে যুক্তিও আছে।

তবে পর্তুগিজদের কাছে বিষয়টি এমন ছিল না। মাত্র ১ কোটি ৭ লাখ জনসংখ্যার এই দেশ—যারা প্রায় এক দশক আগে ইউরো ২০১৬ জয়ের পর কিছুই জিতেনি, তারা আবারও নেশনস লিগ জিতল।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে আমাদের তথ্য মনে রাখার গভীরতা কমছে, কিংবা মস্তিষ্কের ওপর অতিরিক্ত চাপের কারণে হয়তো সেই ম্যাচের স্মৃতি আমার কাছে ঝাপসা হয়ে গেছে। এটি কি আমাদের বর্তমান যুগ ও ‘অ্যাটেনশন ইকোনমি’ বা মনোযোগ আকর্ষণের প্রতিযোগিতার ফল? নাকি অজ্ঞতা? নাকি ক্যারিয়ারে ৯৬১ গোল দেখে ফেলার পর অনুভূতির ভোঁতা হয়ে যাওয়া? নাকি রোনালদোর ক্ষেত্রে ক্রমশ মাঠের পারফরম্যান্সের প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলা?

একে ‘রোনালদো-ক্লান্তি’ বলতে পারেন—২০২২ সালে কাতারের লুসাইলে সেই ঘটনার পর ফুটবলের সামনে এগিয়ে যাওয়া উচিত ছিল বলে যে অনুভূতি তৈরি হয়েছিল। সেবার পর্তুগালের তৎকালীন কোচ ফার্নান্দো সান্তোস রোনালদোকে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে বেঞ্চে বসিয়েছিলেন, আর তার বদলি হিসেবে নামা রামোস শুরুর একাদশে খেলেই ৬-১ গোলের জয়ে হ্যাটট্রিক করেছিলেন।

সেই টুর্নামেন্টের শুরুতেই ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ছেড়ে ‘পারস্পরিক সমঝোতায়’ বিদায় নেওয়া রোনালদো, কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোর কাছে পর্তুগালের বিদায়ের এক মাস পর সৌদি আরবের আল নাসরে যোগ দেন। লক্ষ্য ছিল সৌদি প্রো লিগের ‘রূপান্তর’ এবং যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের (এমবিএস) ‘ভিশন ২০৩০’ বাস্তবায়ন—তেলের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে দেশটির অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনা।

রোনালদো সেখানে তিন বছরের বেশি সময় ধরে আছেন; যেমনটা ছিলেন ইউভেন্তুসে। ১১৭টি গোল করেছেন, কিন্তু সৌদি প্রো লিগ বা এশিয়ান চ্যাম্পিয়নস লিগ জিততে পারেননি। আপনি যদি পর্তুগিজ, সৌদি নাগরিক বা রোনালদোর কট্টর ভক্ত না হন, তবে এর কয়টি ম্যাচ দেখেছেন? কোনোটি কি সহজে মনে পড়ে? যদি একটিও মনে থাকে, তাহলে হয়তো আপনি অনলাইনে একটু বেশিই সময় কাটান।

গত নভেম্বরে রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক এই ফরোয়ার্ড বলেছিলেন, “আমার জন্য স্পেনে গোল করা সৌদির চেয়ে সহজ ছিল।” উপসাগরীয় দেশটিতে তাকে অনুসরণ করে যেসব খেলোয়াড় পাড়ি জমিয়েছেন, তাদের তিনি লিগের শক্তির প্রমাণ হিসেবে দেখিয়েছিলেন। ক্লাব বিশ্বকাপে আল হিলাল বেশ দাপট দেখিয়েছিল; রিয়াল মাদ্রিদের সঙ্গে ১-১ ড্র করে অপরাজিত থেকে গ্রুপ পর্ব পার হয় এবং এরপর শেষ ষোলোয় ম্যানচেস্টার সিটিকে ৪-৩ গোলে হারায়। ‘টোয়েন্টি ফার্স্ট ক্লাব’-এর গবেষণাও বলছে, সৌদি লিগের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের মালিকানাধীন ক্লাবগুলোর মান ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের নিচের সারির দলগুলোর সমান—যারা হয়তো অবনমন এড়াতে লড়ে, কিন্তু তারা শীর্ষ স্তরেরই দল।

তবে সামগ্রিক বিশ্লেষণে সৌদি প্রো লিগ বিশ্বের ২৯তম স্থানে রয়েছে। সুইডিশ লিগ ‘অলসভেনসকানের’ সমপর্যায়ের। এটি প্রতিযোগিতাকে অকারণে ছোট করার চেষ্টা নয়—রোনালদো ও অন্যান্য বড় তারকা যাওয়ার আগেও সৌদি আরবের শক্তিশালী ফুটবল ঐতিহ্য ছিল।

ফুটবল অবশ্যই শুধু প্রিমিয়ার লিগ ও চ্যাম্পিয়নস লিগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কিন্তু এই দুটি আসর নিয়ে এত বেশি আলোচনা ও কন্টেন্ট তৈরি হয় যে, এক বিলিয়নেরও বেশি অনুসরণকারী থাকা সত্ত্বেও অন্য লিগের পক্ষে সেই দেওয়াল ভেদ করা কঠিন।

তবে এই সপ্তাহটি ছিল ব্যতিক্রম, কারণ রোনালদো একটি ম্যাচ না খেলেই শিরোনামে এলেন। মাঠে না নেমেই তিনি প্রাসঙ্গিক ও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠলেন।

একটি দিক থেকে, রোনালদোর না খেলাটা সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অতীতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল কারণ তিনি না থাকলে তার দল দুর্বল হয়ে যেত, জয়ের সম্ভাবনা কমত। সতীর্থরা টানেলে দাঁড়িয়ে এটা বিশ্বাস করত না যে, বল গড়ানোর আগেই তারা ১-০ গোলে এগিয়ে আছে।

চার বছর আগে কাতারে, সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে রোনালদোকে শুরুর একাদশে না রাখাটা তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ বলে মনে হয়েছিল। বাস্তবে তা হয়নি।

সোমবার আল রিয়াদের বিপক্ষে আল নাসরের হয়ে তার না খেলাটা ভিন্ন কারণে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাকে ছাড়াই আল নাসর জিতেছে। সাদিও মানে ১০ জনের আল রিয়াদের বিপক্ষে একমাত্র গোলটি করেছিলেন। শুক্রবার আল ইত্তিহাদের বিপক্ষে ম্যাচেও দ্বিতীয়বারের মতো দলের বাইরে ছিলেন তিনি।

রোনালদোর এই অনুপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলো কারণ সৌদি আরবের সঙ্গে তার সম্পর্কের এবং এমবিএস-এর ‘ভিশন ২০৩০’-এ তার ভূমিকার জন্য এটি কী বার্তা বহন করে। এটি ফুটবলের চেয়ে বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের জন্যই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলো।

তিনি ডেভিড বেকহামের সীমানাও অতিক্রম করেছেন, নিজের শর্তে তারকাখ্যাতিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন; ফুটবলের কারণে বিখ্যাত না থেকে, এখন তিনি ‘বিখ্যাত হওয়ার জন্যই বিখ্যাত’—এমন এক অবস্থানে চলে গেছেন। ফুটবল ক্রমশ রিয়েলিটি শো ‘দ্য কার্ডাশিয়ান্স’-এ কিম কার্ডাশিয়ানের আইনজীবী হওয়ার (বার এক্সাম) পরীক্ষার মতো হয়ে উঠছে—একটি ঘোষিত উদ্দেশ্য থাকলেও এটি আসলে মূল কাহিনীর সাব-প্লট। যেখানে কিম, ক্রিস, ক্লো, কেন্ডাল, কাইলি ও কোর্টনি মিলান, প্যারিস বা কালাবাসাসে কী করছেন, তাদের জিম, মেকআপ ও শেইপওয়্যার ব্র্যান্ড এবং মেট গালায় কী পরছেন—সেটাই মূল আলোচনার বিষয়।

সৌদিতে কোনো গোল কিংবা আরব চ্যাম্পিয়নস কাপে কোনো জয়—রোনালদোর বিলিয়নেয়ার হওয়া, ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং এমবিএস-এর সাত বছর পর প্রথম হোয়াইট হাউস সফরে ইলন মাস্ক, হাওয়ার্ড লুটনিক, জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ও ওপেনএআই-এর প্রেসিডেন্ট গ্রেগ ব্রকম্যানের সঙ্গে সেলফি তোলার মতো আলোচনার জন্ম দেয়নি।

রোনালদোর অভিযোগ, আল নাসর শীতকালীন ট্রান্সফার উইন্ডোতে যথেষ্ট উচ্চাকাঙ্ক্ষা দেখায়নি। ক্লাবটির প্রধান নির্বাহী তার বাল্যবন্ধু ও স্পোর্টিং সিপি একাডেমির গ্র্যাজুয়েট নেলসন সেমেদো এবং কারিগরি পরিচালক প্রভাবশালী সাবেক পর্তুগিজ এজেন্ট সিমাও কুটিনহো। অন্যদিকে আল হিলাল তার পুরনো মাদ্রিদ সতীর্থ করিম বেনজেমাকে আল ইত্তিহাদ থেকে দলে ভিড়িয়েছে। রোনালদোর এই ক্ষোভ অন্তত এটি প্রমাণ করে যে, তিনি এখনো ফুটবল নিয়ে ভাবেন।

কিন্তু কঠোর ফুটবলীয় বিচারে তার ক্যারিয়ারের এই দিকটি নিয়ে আমাদের কতটা ভাবা উচিত?

মাইকেল জর্ডানের কিংবদন্তি বা ‘লিগ্যাসি’ যেমন শিকাগো বুলসেই নির্ধারিত হয়েছিল, ওয়াশিংটন উইজার্ডসে নয়; সেভাবেই ১,০০০ গোলের মাইলফলক ছোঁয়া বা সৌদি প্রো লিগ জয় রোনালদোর ফুটবলীয় উত্তরাধিকারে কতটা প্রভাব ফেলবে?

বাকি আছে শুধু এই গ্রীষ্মের বিশ্বকাপ বা ইউরোপে ফেরা—যেমন জোহান ক্রুইফ আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলেস অ্যাজটেকস ও ওয়াশিংটন ডিপ্লোম্যাটসে খেলার পর ফিরেছিলেন। অথবা রোমান্টিক কোনো সমাপ্তির আশায় স্পোর্টিংয়ের হয়ে দেশে ফিরে কিছু জেতা।

তবে মাঠের বাইরে তার উত্তরাধিকার নিয়ে গল্পটা ভিন্ন।

রোনালদো এখন এই সত্যটিই প্রতিফলিত করছেন যে—সংবাদমাধ্যম, খেলা ও বিনোদন শিল্প এখন ক্রমশ বেশি ‘সংবাদমাধ্যম ও বিনোদন’ কেন্দ্রিক হয়ে উঠছে, ‘খেলা’ সেখানে গৌণ।

তিনি এখন ফুটবলের ভেতরেই ফুটবল-উত্তর এক চরিত্র। না খেললেই যিনি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।