১৮ হাজার ডলারে একটি স্ট্যাটিক HTML পেজ
• ৭ মিনিট
কিছুদিন আগের কথা। তখন আমি ফ্রিল্যান্স বা চুক্তিভিত্তিক কাজ করতাম—এক প্রকল্প থেকে অন্য প্রকল্পে ঘুরে বেড়াতাম। কোনো কাজ এক সপ্তাহের, কোনোটা দুই-তিন মাসের। আমি ছোট প্রকল্পগুলোই বেশি পছন্দ করতাম, কারণ সেগুলোতে দ্রুত কাজ শেষ করে চটজলদি পারিশ্রমিক তোলা যেত। নিজের বস নিজেই ছিলাম, আর খুব বেশি খাটুনি না করেই বেশ ভালো আয় হতো। আমার রেট তখনো যৌক্তিক ছিল, আর কাজের মানের ব্যাপারেও আমি ছিলাম আপোষহীন। কিন্তু এক বড় কোম্পানির সঙ্গে কাজ শুরু করার পর সব হিসাব-নিকাশ বদলে গেল।
কোম্পানিটি আমার সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে যোগাযোগ করে। ম্যানেজার জানালেন, তাদের এমন কাউকে দরকার যে খুব বেশি নির্দেশনা ছাড়াই কাজ সামলে নিতে পারবে। ভালো বা মন্দ—এটাই ছিল আমার নীতি। প্রকল্পটি ছিল একদম আমার পছন্দের মতো: ছোট, দ্রুত এবং ভালো পারিশ্রমিক।
দর কষাকষির পর নির্দেশনাসহ একটা ইমেইল পেলাম। জরুরি হওয়ার কারণও ব্যাখ্যা করা হলো। তাদের আগের ডেভেলপার কাউকে কিছু না জানিয়েই হুট করে কাজ ছেড়ে চলে গেছেন।
নির্দেশনা ছিল সহজ: রিকোয়ারমেন্টগুলো পড়ুন, তারপর কাজটি শেষ করতে কত সময় লাগবে তার একটি হিসাব দিন। ক্যারিয়ারে এত সহজ প্রজেক্ট আমি আর পাইনি। একটি মাত্র HTML পেজ, সামান্য কিছু অ্যানিমেশন আর কয়েকটি এমবেড করা ভিডিও। সন্ধ্যায় চাহিদাগুলো পড়লাম, মনে মনে কাজের পরিকল্পনাও সেরে নিলাম। বছরের পর বছর কাজ করে একটা জিনিস শিখেছি—কোনো ক্লায়েন্টের জন্য কোড লেখার আগে পেমেন্টের নিশ্চয়তা বা ওয়ার্ক অর্ডার বুঝে নিতে হয়।
প্রকল্পটি দেখে একদিনের কাজ বলেই মনে হলো। কিন্তু সতর্কতা হিসেবে আমি ২০ ঘণ্টার এস্টিমেট বা হিসাব দিলাম, যার মূল্যমান মোটামুটি ১৫০০ ডলার। শেষ পর্যন্ত তো এটি একটি সাধারণ HTML পেজ, এর বেশি চার্জ করা যায় না। তারা আমাকে ২৫ মাইল দূরে তাদের স্যাটেলাইট অফিসে আসতে বললেন। কাজের তিন দিন সেখানেই যেতে হবে।
পরদিন স্যাটেলাইট অফিসে পৌঁছালাম। অফিসটি ছিল একটি শপিং সেন্টারে, গোপন দরজার আড়ালে যেন এক গোপন জগৎ—কয়েকজন কর্মী নীরবে কিউবিকেলে বসে কাজ করছেন। রিসেপশনিস্ট আমাকে একটা নতুন ম্যাকবুক প্রো দিলেন, যা একদম শূন্য থেকে সেটআপ করতে হলো। এমনিতে কোম্পানির ল্যাপটপ ব্যবহার করতেই আমি পছন্দ করি, কারণ ফ্রিল্যান্সারদের প্রায়ই সন্দেহজনক সফটওয়্যার ইনস্টল করতে বলা হয়।
সারাদিন কেটে গেল টুলকিট ডাউনলোড, ইমেইল সেটআপ, SSH কি (Key) তৈরি আর বিভিন্ন সার্ভিসে অ্যাক্সেস চাইতে চাইতে। সত্যি বলতে, কাজের কাজ কিছুই হলো না। এজন্যই ২০ ঘণ্টা সময় চেয়েছিলাম—আনুমানিক সময়ের ৮ ঘণ্টা তো শুধু সেটআপ আর প্রস্তুতির পেছনেই চলে গেল।
পরের দিন আসল কাজ শুরু করলাম। ম্যাকবুক প্রো হাতে নিয়ে ম্যানেজারকে ইমেইল করলাম—কাজ করতে আমি প্রস্তুত, কিন্তু যেসব ফাইল বা রিসোর্স প্রয়োজন তা এখনো পাইনি। টিমটিম করে জ্বলতে থাকা বাতির নিচে কিউবিকেলে বসে, অলস সময় কাটাতে কাটাতে সেদিন সূর্য ডুবল।
আবার হিসাব করলাম। আনুমানিক সময় অনুযায়ী আমার হাতে আছে আর ৪ ঘণ্টা। একটি HTML পেজের জন্য এটা অবাস্তব কিছু নয়। কিন্তু পরদিন সেই বাকি ৪ ঘণ্টা কোম্পানির খরচে দুপুরের ভোজেই কেটে গেল—ভালোমন্দ খেলাম, অন্য কর্মীদের সঙ্গে আড্ডা দিলাম।
সময় শেষ হলে ম্যানেজারকে আরেকটি ইমেইল পাঠালাম—জানালাম যে আমি অফিসে উপস্থিত ছিলাম, কিন্তু কাজের প্রয়োজনীয় রিসোর্স এখনো হাতে পাইনি। বলাই বাহুল্য, সেই ইমেইলের কোনো জবাব এল না।
পরের সোমবার বেশ সংকোচ নিয়েই ২৫ মাইল গাড়ি চালিয়ে অফিসে গেলাম। গিয়ে অবাক হলাম—ম্যানেজার নিজেই স্যাটেলাইট অফিসে হাজির, বেশ উৎসাহ নিয়ে আমাকে স্বাগত জানালেন। তিনি ছিলেন ত্রিশের মাঝামাঝি বয়সের একজন সহজ-সরল মানুষ। আমি কিছুটা বিভ্রান্ত হলাম। ফোনে যে জরুরি সুরে কথা বলেছিলেন, তার ছিটেফোঁটাও এখন নেই। বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ আলাপ হলো, কিন্তু কাজের কোনো উল্লেখ নেই। পরে দুপুরের লাঞ্চে নিয়ে গেলেন, বিলও পরিশোধ করলেন। বেশ ভালো একটা দিন কাটল, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হলো না।
মানুষ অভ্যাসের দাস। প্রতিদিন যদি ভালো খাবার আর আদর-যত্ন পাওয়া যায়, তখন সেটাই অভ্যাসে পরিণত হয়। আমার রুটিনও তাই হয়ে গেল। অফিসে আসব, অনলাইনে সময় কাটাব—পড়ালেখা আর ভিডিও দেখা। প্রতিদিন একটি করে ইমেইল পাঠাব, যাতে তারা জানে আমি আছি। তারপর দুপুরের খাওয়া, যার কাছে মজার গল্প আছে তার সঙ্গে আড্ডা। দিন শেষে উঠে দাঁড়াব, হাত-পা ঝেড়ে শান্তির আড়মোড়া ভাঙব, তারপর বাড়ি চলে যাব।
এটাই যেন নিয়ম হয়ে গেল। বরং এমনটাই প্রত্যাশা করতে শুরু করলাম। তাই অবশেষে যখন রিসোর্স বা সামগ্রীর লিঙ্কসহ সেই ইমেইলটি পেলাম, কিছুটা হতাশই হলাম। বাস্তবে ফিরে এলাম, কাজের মুখোশ পরলাম। কিন্তু জিপ ফাইলটা খোলার কিছুক্ষণ পরই বুঝলাম, প্রয়োজনীয় বেশিরভাগ কিছুই সেখানে নেই। ডিজাইনার পাঠিয়েছেন অ্যাডোবি ইলাস্ট্রেটর ফাইল, আর ম্যাকবুকে সেগুলো খোলার কোনো সফটওয়্যার নেই।
ইমেইলের জবাব দিলাম—সমস্যাগুলো ব্যাখ্যা করলাম, আর সময় বাঁচাতে বাড়তি একটি প্রশ্নও জুড়ে দিলাম। তখন আমার কোট করা ২০ ঘণ্টার সময়সীমা পেরিয়ে বহু দিন কেটে গেছে। আমি চাইছিলাম এই কাজটা শেষ করতে। ইমেইল পাঠানোর পরপরই উত্তর এল। লেখা ছিল শুধু: “অ্যালেক্সকে থ্রেডে যোগ করা হলো”—আর অ্যালেক্সকে CC করা হলো। অ্যালেক্স জবাব দিলেন, স্টিভকে যোগ করলেন। স্টিভ জানালেন মিশেল ডিজাইনার, তিনি ভালো জানবেন। মিশেল অটোরিপ্লাই দিয়ে রেখেছেন—তিনি ছুটিতে আছেন, সব জিজ্ঞাসা তার ম্যানেজারকে করতে হবে। তার ম্যানেজার উল্টো জিজ্ঞেস করলেন, “ইব্রাহিম কে?” আমার ম্যানেজার তখন সবার কাছে ক্ষমা চাইলেন আমাকে পরিচয় করিয়ে না দেওয়ার জন্য।
ঠিকাদার হিসেবে আমি সাধারণত নিঃশব্দে কোম্পানিতে ঢুকি আর কাজ শেষে বেরিয়ে যাই—কেউ টেরই পায় না। কিন্তু এখানে যেন ‘স্বাগতম’ জানানো ইমেইলের বন্যা বয়ে গেল। ইমেইল চালাচালি চলতেই থাকল, আর আমাকেও সেই বিরক্তিকর ও অপ্রয়োজনীয় বার্তাগুলোর জবাব দিতে হলো। কেউ কেউ আমার সঙ্গে সরাসরি দেখা করতেও উৎসুক ছিলেন। আমি ক্যালিফোর্নিয়ায় আছি শুনে তারা কিছুটা হতাশ হলেন, আর ওখানের সুন্দর আবহাওয়ার কথা শুনে ঈর্ষাও করলেন।
তারা ভদ্রতার আড়ালে আমার ইমেইল উপেক্ষা করলেন। প্রশ্ন এড়াতে ব্যবহার করলেন CC। আর আমার যেকোনো জিজ্ঞাসা উড়িয়ে দিতে ব্যবহার করলেন স্প্যাম। দিনগুলো কাটতে লাগল একজন প্রত্নতাত্ত্বিকের মতো—ইমেইলের স্তূপ খনন করে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার কাজে। কল্পনা করতে পারেন কেমন ‘ইমপোস্টার সিন্ড্রোম’-এ (Imposter Syndrome) ভুগতাম, যখনই মনে পড়ত আমার একমাত্র কাজ সামান্য একটি স্ট্যাটিক HTML পেজ বানানো! অতিরঞ্জিত ২০ ঘণ্টার প্রকল্পটি পরিণত হলো ৭ সপ্তাহের এক অদ্ভুত অ্যাডভেঞ্চারে—বিনামূল্যে দুপুরের খাওয়া, প্রতিদিন ৫০ মাইল ড্রাইভ, আর ইমেইলের খননকাজ।
অবশেষে প্রকল্পটি শেষ করলাম, গিটহাবে (GitHub) টিমের কাছে কোড পাঠালাম। সব মহান অভিযানেরই শেষ আছে। কিন্তু তারপরই এল আমন্ত্রণ—গুগল হ্যাংআউটে পুরো টিম আমার কোড রিভিউ করবে। এক মাসের বেশি সময় ধরে একটি স্ট্যাটিক HTML পেজ বানিয়েছি, এখন পুরো টিম সেটা নিয়ে কাটাছেঁড়া করবে? নিজের সাফাই গাইতে বললাম, পেজটিতে কিছু জাভাস্ক্রিপ্ট ইন্টারঅ্যাকশন ছিল, রেসপনসিভ ডিজাইন ছিল, CSS অ্যানিমেশনও ছিল… তবু নিজেকে প্রতারকই মনে হচ্ছিল।
অবশ্যই, ভিডিও মিটিং কয়েকবার পেছাল। যখন অবশেষে মিটিং হলো, আমার কাজ বা আমি কেউই আলোচনার বিষয় ছিলাম না। তারা সবাই নিউইয়র্কের একই রুমে বসে নিজেদের শখের গল্প করলেন। প্রকল্প নিয়ে যা বললেন তা হলো:
“হেই, কেউ কি স্পন্সরড পেজটার কাজ করছে?”
“হ্যাঁ, মনে হয় শেষ হয়েছে।”
“দারুণ, আজ রাতেই কোড মার্জ করব।”
সেই রাতে বাড়ি ফিরে বুঝলাম, আমি আরেকটা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ৭ সপ্তাহ ধরে এই কোম্পানিতে কাজ করেছি, আর আমার মূল চুক্তি ছিল ১,৫০০ ডলারের। বছরে ১১,১০০ ডলার বা সপ্তাহে ২১৪ ডলার। আরও স্পষ্ট করে বললে, ঘণ্টায় ৫.৩৫ ডলার।
যেমনটা ধারণা করেছিলাম, কোনো জবাব পেলাম না। বড় কোম্পানিগুলোর একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো—বিল মেটাতে তাদের তেমন তাড়া থাকে না। নিজেকে প্রতারক মনে হচ্ছিল, এত সহজ কাজের জন্য এত টাকা চার্জ করছি! কিন্তু এটা কোনো দানছত্র ছিল না। প্রতিদিন ৫০ মাইল গাড়ি চালিয়ে আমি কাজ করতে এসেছি, কাজ না হওয়ার দায় আমার ছিল না—ছিল তাদের ধীরগতির।
পরের সপ্তাহে জবাব এল। ম্যানেজারের একটি নিরস ইমেইল—প্রতিটি কাজের দিনকে তিনি ঘণ্টাভিত্তিতে ভাগ করে দিয়েছেন। তারপর যেসব ঘণ্টায় আমি উপস্থিত ছিলাম সেগুলো হাইলাইট করলেন, প্রতিদিন এক ঘণ্টা দুপুরের বিরতি হিসেবে বাদ দিলেন। শেষে আমাদের চুক্তি অনুযায়ী রেট ধরে হিসাব করলেন।
দেখা গেল, আমিই ভুল ছিলাম। আমার মোট হিসেবে ভুল ছিল। সংশোধনের পর তাদের প্রদেয় টাকার পরিমাণ দাঁড়াল ২১,০০০ ডলার।
“সংশোধিত ঘণ্টাগুলো কনফার্ম করুন, যাতে অ্যাকাউন্টিং বিভাগ চেক ইস্যু করতে পারে।”
আমি কালবিলম্ব না করে দ্রুত ঘণ্টাগুলো কনফার্ম করলাম।